عن أبي بكرة رضي الله عنه قال: قال النبي صلى الله عليه وسلم: «أَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِأَكْبَرِ الْكَبَائِرِ؟» ثَلَاثًا، قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ، قَالَ: «الْإِشْرَاكُ بِاللهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ» وَجَلَسَ وَكَانَ مُتَّكِئًا، فَقَالَ: «أَلَا وَقَوْلُ الزُّورِ»، قَالَ: فَمَا زَالَ يُكَرِّرُهَا حَتَّى قُلْنَا: لَيْتَهُ سَكَتَ.
আবূ বাকরাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমি কি তোমাদেরকে সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ সম্পর্কে সংবাদ দেব না?” তিনবার বললেন, তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! অবশ্যই বলুন। তিনি বললেন, “আল্লাহর সঙ্গে শির্ক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া”। তিনি হেলান দিয়েছিলেন, এবার সোজা হয়ে বসলেন আর বললেন, “সাবধান! মিথ্যা কথা বলা”। তিনি বলেন, তিনি তা বারবার বলতে থাকলেন অবশেষে আমরা বললাম, যদি তিনি চুপ করতেন।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমমানসহীহ
ব্যাখ্যা
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহ সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন, তার প্রেক্ষিতে এই তিনটি উল্লেখ করেছেন:
১- আল্লাহর সাথে শির্ক করা: আর তা হলো ইবাদতের প্রকারসমূহ থেকে কোনো প্রকার ইবাদত আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য সাব্যস্ত করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে তাঁর ইবাদতের একত্বে, তাঁর একক প্রভুত্বে এবং নাম ও সিফাতসমূহে তাঁর সমকক্ষ করা।
২- পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া: পিতা-মাতার জন্য কষ্টদায়ক যাবতীয় আচরণ অবাধ্য হওয়ার অন্তর্ভুক্ত। সেটি কথা হোক বা কর্ম হোক এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা ছেড়ে দেওয়া।
৩- মিথ্যা কথা বলা; তার-ই প্রকার হলো মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া: আর তা হচ্ছে প্রত্যেক বানানো ও মিথ্যা কথা যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, মিথ্যা যার বিপক্ষে যায় তার সম্পদ দখল করে তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা অথবা তার সম্মানের উপর সীমালঙ্ঘন করা অথবা তার মত কিছু করা।
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিথ্যা কথার অসারতা এবং সমাজে তার খারাপ প্রভাবের উপর সাবধান করে তার থেকে সতর্কীকরণ কে বারবার উচ্চারণ করেছেন, অবশেষে সাহাবীগণ বললেন: যদি তিনি চুপ করতেন, (তারা এটা বলেছেন) তার প্রতি করুনা করে এবং ওই জিনিসকে অপছন্দ করে যা তাকে বিরক্ত করছিল।
শিক্ষা
সবচেয়ে বড় গুনাহ হলো আল্লাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করা; কারণ তিনি তা কবিরা গুনাহসমূহের শির্ষে উল্লেখ করেছেন এবং তাকে সবচেয়ে বড় সাব্যস্ত করেছেন। এই বক্তব্যকে শক্তিশালী করে আল্লাহর বাণী:{إن الله لا يَغْفِرُ أن يشرَكَ به وَيَغْفِرُ مَا دونَ ذلِكَ لِمَنْ يشَاء}. “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করবেন না; আর তার থেকে নিম্ন যে কোন গোনাহ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করে দিবেন।”
পিতা-মাতার হকের গুরুত্ব; কারণ আল্লাহ তা‘আলা নিজের হকের সাথে তাদের হককে যুক্ত করেছেন।
গুনাহসমূহ সগিরা ও কবিরা দু’ভাগে ভাগ হয়: কবিরা হলো সেসব গুনাহ যার ব্যাপারে দুনিয়াবী শাস্তি রয়েছে, যেমন দন্ডাদেশ-সাজা ও লানত; অথবা পরকালীন কঠোর হুশিয়ারী রয়েছে, যেমন জান্নামে প্রবেশ করার হুশিয়ারী। কবিরা গুনাহসমূহের অনেক স্তর রয়েছে। হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে কতক গুনাহ কতক গুনাহ থেকে গুরুতর। কবিরা গুনাহসমূহ ছাড়া বাকি সব গুনাহ সগিরা।
সূত্র
صحيح البخاري (3/ 172) (2654)، (8/ 4) (5976)، (8/ 62) (6273-6274).
صحيح مسلم (1/ 91) (87).
عمدة الأحكام من كلام خير الأنام صلى الله عليه وسلم (ص257) (380).
شرح النووي على مسلم (2/ 81).
الإلمام بشرح عمدة الأحكام لإسماعيل الأنصاري (2/ 149).
تيسير العلام شرح عمدة الأحكام للبسام (ص703).
أعلام السنة المنشورة لاعتقاد الطائفة الناجية المنصورة، لحافظ بن أحمد الحكمي (ص111).
হাসান (বসরী) (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জুনদুব ইবনু আবদুল্লাহ (রা.) বসরার এ মসজিদে আমাদের কাছে হাদীস বর্ণনা করেন। সেদিন থেকে আমরা না হাদীস ভুলেছি না আশঙ্কা করেছি যে, জুনদুব (রা.) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছেন। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের পূর্ববর্তী যুগে একজন লোক আঘাত পেয়েছিল, তাতে সে কাতর হয়ে পড়েছিল। এরপর সে একটি ছুরি হাতে নিল এবং তা দিয়ে সে তার হাতটি কেটে ফেলল। ফলে রক্ত আর বন্ধ হল না। শেষ পর্যন্ত সে মারা গেল। মহান আল্লাহ বললেন: আমার বান্দাটি নিজেই প্রাণ দেয়ার ব্যাপারে আমার চেয়ে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করল (অর্থাৎ সে আত্মহত্যা করল)। কাজেই, আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিলাম।”
সহীহ বুখারী ও মুসলিমমানসহীহ
ব্যাখ্যা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন যে, আমাদের আগের একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে একজন লোক ছিল, যে আঘাত পেয়েছিল এবং ব্যথা সহ্য করতে না পেরে একটি ছুরি নিয়ে তার হাত কেটে ফেলল এবং মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করল। রক্তক্ষরণ বন্ধ হওয়ার আগেই সে মারা গেল। আল্লাহ তা'আলা বললেন: আমার বান্দাটি নিজেই প্রাণ দেয়ার ব্যাপারে আমার চেয়ে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করল, আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিলাম।
শিক্ষা
বিপদে ধৈর্যধারণের ফযীলত এবং ব্যথা-কষ্টে অসন্তুষ্ট না হওয়া, যাতে তা আরও বড় বিপদে পরিণত না হয়।
পূর্ববর্তী উম্মতদের সম্পর্কে এমন ঘটনা বর্ণনা করা যা কল্যাণকর এবং শিক্ষণীয়।
ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন: এতে আল্লাহর অধিকার এবং সৃষ্টির প্রতি তাঁর রহমত দেখানো হয়েছে, যেহেতু তিনি তাদের উপর আত্মহত্যাকে হারাম করেছেন, কারণ জীবন আল্লাহর মালিকানাধীন।
কাউকে হত্যা বা আত্মহত্যার দিকে পরিচালিত করে এমন কোন উপায় অবলম্বন করা হারাম এবং এ ব্যাপারে কঠোর সতর্কবাণী রয়েছে।
ইবনে হাজার (রহ.) বলেছেন: এটি প্রমাণ করে যে সে মৃত্যুর ইচ্ছায় হাত কেটেছিল, এমন চিকিৎসার উদ্দেশ্যে নয়, যে চিকিৎসার মাধ্যমে উপকার পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি ছিল।
সূত্র
صحيح البخاري (4/ 170) (3463).
صحيح مسلم (1/ 107) (113).
فتح الباري، لابن حجر (3/ 227).
شرح النووي على مسلم (2/ 127).
تيسير العلام شرح عمدة الأحكام، لعبد الله البسام (ص651).
عن عبد الله بن عمرو بن العاص رضي الله عنهما عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: «الْكَبَائِرُ: الْإِشْرَاكُ بِاللهِ، وَعُقُوقُ الْوَالِدَيْنِ، وَقَتْلُ النَّفْسِ، وَالْيَمِينُ الْغَمُوسُ».
’আবদুল্লাহ্ ইবনু ’আমর ইবনুল ‘আস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন “কবীরা গুনাহ হলো: আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, পিতা-মাতার নাফরমানী করা, কাউকে হত্যা করা এবং মিথ্যা কসম করা।”
এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন।মানসহীহ
ব্যাখ্যা
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে কবীরা গুনাহর বর্ণনা করেছেন, আর তা হলো সেসব গুনাহর কারণে তাতে ব্যক্তিকে দুনিয়া ও আখিরাতের কঠিন শাস্তির ধমক শোনানো হয়েছে।
সর্বপ্রথম কবীরা গুনাহ হলো “আল্লাহর সাথে শরীক করা”: আর তা হলো কোনো প্রকার ইবাদতকে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য সাব্যস্ত করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে তাঁর ইবাদতের একত্বে, তাঁর একক প্রভুত্বে এবং নাম ও সিফাতসমূহে তাঁর সমকক্ষ করা।
দ্বিতীয় কবীরা গুনাহ হলো “পিতা-মাতার নাফরমানী করা”: আর তা হলো প্রত্যেক এমন বিষয় যা পিতা-মাতার কষ্টের কারণ হয়। সেটা কথা হোক অথবা কর্ম হোক, এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করা থেকে বিরত থাকা।
তৃতীয় কবীরা গুনা হলো অন্যায়ভাবে “কাউকে হত্যা করা”, যেমন জুলম ও সীমালঙ্ঘন করে হত্যা করা।
চতুর্থ কবীরা গুনাহ হলো “মিথ্যা কসম খাওয়া”: আর তা হলো নিজ থেকে মিথ্যা জানার পরও মিথ্যা কসম করা। মিথ্যা কসমকে গামুস (ডুবিয়ে দেওয়া) নামকরণ করার কারণ হলো: এই কসম ব্যক্তিকে পাপে অথবা আগুনে ডুবিয়ে দেয়।
শিক্ষা
মিথ্যা কসম করা এতো বড় ও ভয়ঙ্কর অপরাধ যে, তার কোনো কাফফারা নেই, তার জন্য জরুরী উপায় হলো তাওবাহ।
এই চারটি পাপ বড় ও ভয়ঙ্কর বুঝানোর জন্য উল্লেখ করা হয়েছে, কবীরা গুনাহকে সীমাবদ্ধ করার জন্যে নয়।
গুনাহসমূহ সগিরা ও কবিরা দু’ভাগে ভাগ হয়: কবিরা হলো সেসব গুনাহ যার ব্যাপারে দুনিয়াবী শাস্তি রয়েছে, যেমন দন্ডাদেশ-সাজা ও লানত; অথবা পরকালীন কঠোর হুশিয়ারী রয়েছে, যেমন জান্নামে প্রবেশ করার হুশিয়ারী। কবিরা গুনাহসমূহের অনেক স্তর রয়েছে। হারাম হওয়ার ক্ষেত্রে কতক গুনাহ কতক গুনাহ থেকে গুরুতর। কবিরা গুনাহসমূহ ছাড়া বাকি সব গুনাহ সগিরা।
সূত্র
صحيح البخاري (8/ 137) (6675).
بهجة الناظرين شرح رياض الصالحين، لسليم الهلالي (1/ 408).
رياض الصالحين للنووي (ص125) (337).
كنوز رياض الصالحين، لمجموعة من الباحثين (5/ 610).
تطريز رياض الصالحين، لفيصل آل مبارك (ص964).
আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: সৎ সঙ্গী ও অসৎ সঙ্গীর উদাহরণ হল, কস্তুরী বহনকারী (আতরওয়ালা) ও হাপরে ফু দানকারী (কামারের) ন্যায়। কস্তুরী বহনকারী (আতরওয়ালা) হয়তো তোমাকে কিছু দান করবে অথবা তার কাছ থেকে তুমি কিছু খরিদ করবে অথবা তার কাছ থেকে সুবাস লাভ করবে। আর হাপরে ফুঁ দানকারী (কামার) হয়ত তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে অথবা তুমি তার কাছ থেকে দুর্গন্ধ পাবে।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমমানসহীহ
ব্যাখ্যা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই শ্রেণির লোকের একটি উদাহরণ উপস্থাপন করেছেন:
প্রথম প্রকার: উত্তম বন্ধু ও সহচর, যে আল্লাহ এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথ দেখায় এবং আনুগত্যের কাজে সাহায্য করে। সে একজন কস্তুরী বিক্রেতার মত, হয় সে আপনাকে তার থেকে কিছুটা দেবে অথবা আপনি তার কাছ থেকে কিনবেন অথবা আপনি তার কাছ থেকে একটি সুন্দর ঘ্রাণ পাবেন।
দ্বিতীয় প্রকার: খারাপ বন্ধু এবং সহচর। যে মানুষকে আল্লাহর পথে বাধা দেয় এবং পাপ কাজে সাহায্য করে। আপনি তার কাছ থেকে কুৎসিত কাজ দেখতে পাবেন এবং আপনি তার মত কাউকে সঙ্গ দেওয়া এবং তার সাথে বসার জন্য নিন্দিত হবেন। সে একজন কামারের মত যে তার আগুনে ফুঁক দেয়। হয় সে তার উড়ন্ত স্ফুলিঙ্গ থেকে আপনার জামা-কাপড় পুড়িয়ে দেবে, অথবা আপনি তার কাছ থেকে খারাপ গন্ধ পাবেন।
শিক্ষা
অর্থকে শ্রোতার কাছাকাছি আনতে দৃষ্টান্ত ব্যবহার করা জায়েজ।
আনুগত্যশীল ও ভালো লোকদের সাথে উঠাবসা করতে এবং বিশৃংখলাকারী ও খারাপ লোকদের থেকে দূরে থাকতে উৎসাহিত ও উদ্ভুদ্ধ করা হয়েছে।
সূত্র
صحيح البخاري (7/ 96) (5534).
صحيح مسلم (4/ 2026) (2628).
بهجة الناظرين شرح رياض الصالحين، لسليم الهلالي (1/ 431).
نزهة المتقين شرح رياض الصالحين، مجموعة من الباحثين (1/ 339).
شرح النووي على مسلم (16/ 178).
عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: «اجْتَنِبُوا السَّبْعَ الْمُوبِقَاتِ»، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ وَمَا هُنَّ؟ قَالَ: «الشِّرْكُ بِاللهِ، وَالسِّحْرُ، وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللهُ إِلَّا بِالْحَقِّ، وَأَكْلُ الرِّبَا، وَأَكْلُ مَالِ الْيَتِيمِ، وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ، وَقَذْفُ الْمُحْصَنَاتِ الْمُؤْمِنَاتِ الْغَافِلَاتِ».
আবূ হুরায়রা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে।” সাহাবীগণ বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেগুলো কি কি? তিনি বললেন: “(১) আল্লাহর সাথে শিরক করা। (২) যাদু (৩) আল্লাহ তা‘আলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরীয়তসম্মত কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করা (৪) সুদ খাওয়া (৫) ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা (৬) রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং (৭) সরল প্রকৃতির সতী মুমিন নারীদের অপবাদ দেওয়া।”
সহীহ বুখারী ও মুসলিমমানসহীহ
ব্যাখ্যা
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর উম্মাতকে সাতটি ধ্বংসাত্মক অপরাধ থেকে দূরে থাকতে নির্দেশ দিয়েছেন। তাকে সেগুলো সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে, তিনি তা স্পষ্ট করে বর্ণনা করলেন:
প্রথম: আল্লাহর সাথে শিরক করা: যে কোন দিক বিবেচনায় আল্লাহর সাথে তাঁর কোন সমকক্ষ বা অনুরূপ সমমর্যাদাবান সাব্যস্ত করা। যে কোন ইবাদাত আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো উদ্দেশ্যে করা। তিনি শিরক এর দ্বারা বর্ণনা শুরু করেছেন; কেননা এটি সবচেয়ে মারাত্মক গুনাহ।
দ্বিতীয়: যাদু: গিরা লাগানো, মন্ত্র, অসমর্থিত চিকিৎসা এবং ধোঁয়া প্রয়োগ ইত্যাদি, যা হত্যা, রোগ-ব্যাধি বা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে আলাদা করার জন্য যাদুগ্রস্তের শরীরে প্রভাব ফেলে। এটি একটি শয়তানী কাজ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি শিরক এবং খবিশ আত্মা যা পছন্দ করে সেগুলোর মাধ্যমে তাদের নৈকট্য লাভ করার মাধ্যমে অর্জিত হয়।
তৃতীয়: আল্লাহ তা‘আলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরীয়তসম্মত কারণ ব্যতিরেকে যা বিচারক বাস্তবায়ন করে থাকে, এমন ব্যক্তিকে হত্যা করা।
চতুর্থ: সুদ খাওয়া: সুদ খাওয়া বা অন্য কোন উপায়ে সুদের দ্বারা উপকৃত হওয়া।
পঞ্চম: যার নাবালেগ অবস্থায় পিতা মারা যায় এমন ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা।
ষষ্ঠ: কাফিরদের বিরুদ্ধে চলমান রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া।
সপ্তম: স্বাধীন (সরল প্রকৃতির) স্বচ্চরিত্রের অধিকারী নারীদেরকে যিনার অপবাদ দেওয়া, এমনিভাবে পুরুষদের বিরুদ্ধেও অপবাদ দেওয়া।
শিক্ষা
কবীরা গুনাহ সাতটির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। হাদীসে এ সাতটিকে বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ হলো: এগুলো সর্বাধিক বড় ও মারাত্মক গুনাহ।
কাউকে হত্যা করা তখনই জায়েয হবে, যখন তা ন্যায়সঙ্গত কারণে হবে, যেমন: কিসাস, ধর্মত্যাগ, বিবাহিত নারী-পুরুষের যিনা ইত্যাদি এবং এটি শরী‘আহসম্মত বিচারক বাস্তবায়ন করবেন।
সূত্র
صحيح البخاري (4/ 10) (2766).
صحيح مسلم (1/ 92) (89).
شرح صحيح البخارى لابن بطال (8/ 489).
الملخص في شرح كتاب التوحيد، للشيخ صالح الفوزان (ص201).
عن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه مرفوعًا: «ليس مِنْ نَفْسٍ تُقْتَلُ ظُلماً إِلاَّ كَان على ابنِ آدَمَ الأَوَّل كِفْلٌ مِن دمِهَا؛ لِأَنَّه كان أوَّل مَن سَنَّ القَتْلَ».
ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে মারফু হিসেবে বর্ণিত, “যে কোন প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে, তার পাপের একটা অংশ আদমের প্রথম সন্তান (কাবীল) এর উপর বর্তাবে। কেননা, সে হত্যার রীতি সর্বপ্রথম চালু করেছে।”
মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি (বুখারী ও মুসলিম)।মানসহীহ
ব্যাখ্যা
যে কোন প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার দায়ভার আদমের এক সন্তানের বহন করার কারণ এ হাদীসটি বর্ণনা করছে। কারণ, কাবীল তার ভাই হাবীলকে প্রতিহিংসা পরায়ণ হয়ে হত্যা করেছে। আদম সন্তানের মধ্যে এটিই ছিল সর্ব প্রথম হত্যাকান্ড। সুতরাং কাবীল তারপর যত হত্যাকান্ড ঘটবে তার একটি গুনাহ বহন করবে। কারণ, সেই সর্ব প্রথম হত্যা করার প্রচলন করে। তারপর যারাই এ ধরনের কর্ম করবে সে তাঁরই অনুকরণ করল। যদিও (তার মাঝে ও হত্যাকারীর মাঝে) একটি মাধ্যম বা একাধিক মাধ্যম।
সূত্র
تطريز رياض الصالحين، فيصل بن عبد العزيز المبارك، تحقيق: عبد العزيز بن عبد الله آل حمد، دار العاصمة للنشر والتوزيع، الرياض، الطبعة: الأولى 1423هـ، 2002م.
دليل الفالحين لطرق رياض الصالحين، محمد علي بن البكري بن علان، اعتنى بها: خليل مأمون شيحا، دار المعرفة، بيروت، الطبعة: الرابعة 1425هـ.
رياض الصالحين من كلام سيد المرسلين، أبو زكريا محيي الدين النووي، تحقيق ماهر الفحل، دار ابن كثير، دمشق، بيروت، الطبعة: الأولى 1428هـ.
كنوز رياض الصالحين، مجموعة من الباحثين برئاسة حمد بن ناصر العمار، كنوز إشبيليا، الرياض، الطبعة: الأولى 1430هـ.
صحيح البخاري، محمد بن إسماعيل البخاري الجعفي، تحقيق: محمد زهير الناصر، دار طوق النجاة (مصورة عن السلطانية بإضافة ترقيم: محمد فؤاد عبد الباقي)، الطبعة: الأولى 1422هـ.
صحيح مسلم، مسلم بن الحجاج القشيري النيسابوري، تحقيق محمد فؤاد عبد الباقي، دار إحياء التراث العربي، بيروت، الطبعة: 1423هـ.
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! যদি কেউ আমার সম্পদ ছিনিয়ে নিতে উদ্যত হয় তবে আমি কি করব? তিনি বললেন, “তুমি তাকে তোমার সম্পদ নিতে দিবে না”। লোকটি বলল, যদি সে আমার সাথে এ নিয়ে মারামারি করে? তিনি বললেন, “তুমি তার সাথে মারামারি করবে”। লোকটি বলল, আপনি কি বলেন যদি সে আমাকে হত্যা করে? তিনি বললেন- “তা হলে তুমি শহীদ বলে গণ্য হবে”। লোকটি বলল, আপনি কি মনে করেন, যদি আমি তাকে হত্যা করি? তিনি বললেনঃ “সে জাহান্নামী”।
ইমাম মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেনমানসহীহ
ব্যাখ্যা
এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কী বলেন যদি কোন লোক এসে আমার সম্পদ নিতে চায়? তিনি বললেন: তুমি তার কাছে আত্মসমর্পণ করতে এবং তাকে তোমার টাকা দিতে বাধ্য নও। সে বলল: আপনি কী লক্ষ্য করেছেন যদি সে আমার সাথে মারামারি করে? তিনি বললেন: তার সাথে মারামারি করা তোমার জন্য জায়েয। সে বলল: যদি সে আমাকে মেরে ফেলে? তিনি বললেন: তাহলে তুমি শহীদ। সে বলল: আপনি লক্ষ্য করেছেন কী যদি আমি তাকে মেরে ফেলি? তিনি বললেন: কিয়ামতের দিন সে জাহান্নামে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য।
শিক্ষা
ইমাম নববী রহ. বলেন: বিনা বিতর্কে নারীদের রক্ষা করা ফরয। আমাদের মাযহাব এবং অন্যদের মাযহাবে হত্যা করে জীবন রক্ষা করার বিষয়ে বিরোধ রয়েছে। আর সম্পত্তি রক্ষার ক্ষেত্রে প্রতিরোধ গড়ে তোলা জায়েয, ওয়াজিব নয়।
হাদীসটি প্রমাণ করে যে ইলম আমলের আগে জরুরি, যেমন এই সাহাবী আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করেছেন যে, আমলের আগে তাকে কী করতে হবে।
আক্রমণকারীর সাথে মারামারি শুরু করার আগে উপদেশ বা সাহায্যের ডাক দিয়ে তাকে প্রতিরোধ করার ক্রম অনুসরণ করা উচিত, যদি সে তার সাথে লড়াই শুরু করে, তাহলে তার কাজ হল তাকে হত্যা করার পরিবর্তে তাড়িয়ে দেওয়া।
একজন মুসলিমের রক্ত, অর্থ এবং সম্মান হারাম-পবিত্র।
আন-নওয়াবী বলেন: জেনে রাখুন যে শহীদ তিন প্রকার: তাদের মধ্যে একজন হলেন সেই ব্যক্তি যিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হত্যার উপায়সমূহের কোনো উপায়ে নিহত হয়েছেন। এর জন্য শহীদদের হুকুম হবে আখেরাতের সাওয়াব এবং দুনিয়ার বিধানের ক্ষেত্রে, অর্থাৎ তাকে গোসল দেওয়া হবে না এবং তার জানাজার সালাত পড়া হবে না। দ্বিতীয়জন হলেন সওয়াবের দিক থেকে শহীদ, কিন্তু পার্থিব বিধানের দিক থেকে নয়। সে হলো সেই ব্যক্তি যে পেটের রোগে মারা যায়, যে ছুরিকাঘাতে মারা যায়, যে ধসে পড়া ভবনের আঘাতে পিষ্ট হয়, যে তার সম্পত্তি রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয় এবং অন্য যাদেরকে সহীহ হাদীসে শহীদ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একে গোসল দেওয়া হবে, তার জানাজা পড়া হবে এবং আখেরাতে সে শহীদদের সওয়াব পাবে। এটা জরুরী নয় যে তার জন্য প্রথমের সওয়াবের মতোই হবে। তৃতীয় ব্যক্তি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি যুদ্ধের গনীমত ইত্যাদিতে খিয়ানত করেছেন, হাদীসে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহত হলে যাকে শহীদ ঘোষণা করা অস্বীকার করা হয়েছে। এই পৃথিবীতে শহীদদের মতোই তারও হুকুম, তাকে গোসল দেওয়া হবে না, তার জানাজা পড়ানো হবে না এবং পরকালে তাদের পূর্ণ প্রতিদানও সে প্রাপ্ত হবে না।
সূত্র
صحيح مسلم (1/ 124) (140).
بهجة الناظرين شرح رياض الصالحين، لسليم الهلالي (2/ 449).
نزهة المتقين شرح رياض الصالحين، لمجموعة من الباحثين (2/ 936).
شرح رياض الصالحين، لابن عثيمين (5/ 389).
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “আমার সকল উম্মত ক্ষমা পাবে, তবে পাপ-প্রকাশকারী ব্যতীত। আর এক প্রকার প্রকাশ এই যে, কোনো ব্যক্তি রাতে কোনো পাপকাজ করে, যা আল্লাহ গোপন রাখেন; কিন্তু সকাল বেলা সে বলে বেড়ায়, ‘হে অমুক! আমি আজ রাতে এই এই কাজ করেছি।’ অথচ সে এমন অবস্থায় রাত্রি অতিবাহিত করেছিল যে, আল্লাহ তার পাপ গোপন রেখেছিলেন; কিন্তু সে সকালে উঠে তার উপর আল্লাহর আবৃত পর্দা খুলে ফেলে”।
সহীহ বুখারী ও মুসলিমমানসহীহ
ব্যাখ্যা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসে বর্ণনা করেছেন যে, গুনাহগার মুসলিমের জন্যে আল্লাহর ক্ষমা ও মার্জনা আশা করা যায়; সেই ব্যক্তি ব্যতীত যে অহংকার ও ঔদ্ধত্যের সাথে নিজের পাপ ঘোষণা করে। ফলে সে আল্লাহর ক্ষমার অযোগ্য। যেমন সে রাতে কোনো পাপকাজ করে, অতঃপর সকাল করে, আর আল্লাহ তা গোপন রাখেন; কিন্তু সকাল বেলা সে বলে বেড়ায় যে, সে গতরাতে অমুক পাপকাজ করেছে। অথচ সে এমন অবস্থায় রাত্রি অতিবাহিত করেছিল যে, তার রব তার পাপ গোপন রেখেছিলেন; কিন্তু সে সকালে উঠে তার উপর আল্লাহর আবৃত পর্দা খুলে ফেললো!!
শিক্ষা
যে ব্যক্তির পাপকাজ আল্লাহ গোপন রেখেছেন, তা প্রকাশ করা অন্যায়।
পাপ করে তা প্রকাশ করা মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়ানো হয়।
আল্লাহ যার পাপ এই দুনিয়াতে গোপন রাখেন,আখিরাতেও তিনি তার পাপ গোপন করবেন। আর এটা বান্দাদের প্রতি মহান আল্লাহর প্রশস্ত রহমত।
যে ব্যক্তি কোন পাপ কাজে পতিত হয়ে যায় ,তার উচিত নিজের পাপ গোপন রাখা এবং আল্লাহর কাছে তাওবা করা।
যারা ইচ্ছাকৃতভাবে পাপ প্রকাশ করে, তাদের বড় অপরাধ হলো, তারা নিজেদের জন্য ক্ষমার সুযোগ হারিয়ে ফেলে।
সূত্র
صحيح البخاري (8/ 20) (6069).
صحيح مسلم (4/ 2291) (2990).
شرح رياض الصالحين، لابن عثيمين (3/ 15).
منار القاري شرح مختصر صحيح البخاري، لحمزة قاسم (5/ 251).
بهجة الناظرين شرح رياض الصالحين، لسليم الهلالي (1/ 329).
نزهة المتقين شرح رياض الصالحين، مجموعة من الباحثين (1/ 255).
এখানকার প্রতিটি হাদীস, মান, ব্যাখ্যা ও শিক্ষা HadeethEnc.com যেভাবে প্রকাশ করে হুবহু সেভাবেই দেখানো, তাদের পুনঃপ্রকাশের শর্ত মেনে। মানের সঙ্গে মান-নির্ধারকের নাম নেই। অনুবাদ ও ব্যাখ্যা এর লেখকদের নিজস্ব, এবং কোনো কোনোটিতে বিধান বলা আছে; সাবীলের পর্যালোচকেরা এগুলো যাচাই করেননি। আরবি হাদীসটিই মূল পাঠ। উৎস: HadeethEnc.com