عن وَاثِلَةَ بن الأَسْقَعِ ـ رضي الله عنه ـ مرفوعاً: «إن من أعظم الفِرَى أن يَدَّعِيَ الرجلُ إلى غير أبيه، أو يُرِي عَيْنَهُ ما لم تَرَ، أو يقول على رسول الله صلى الله عليه وسلم ما لم يَقْلْ».
ওয়াছেলা ইবনুল আছকা‘ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে মারফূ‘ সনদে বর্ণিত, “নিশ্চয় সবচেয়ে বড় মিথ্যাসমূহের অন্যতম হলো, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক এমন কাউকে পিতা বলে দাবী করা যিনি তার পিতা নয়। অথবা আপন চক্ষু দিয়ে (স্বপ্নে) এমন কিছু দেখার দাবি করা যা দেখতে পায়নি। অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর এমন কথা বলার দাবি করা যা তিনি বলেন নি।”
এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন।মানসহীহ
ব্যাখ্যা
মহান আল্লাহর ওপর সবচেয়ে কঠোর মিথ্যাচার হলো, কোনো ব্যক্তি নিজে তার আসল পিতাকে বাদ দিয়ে অপর কাউকে পিতা হওয়ার দাবি করলো বা অন্য কেউ তাকে অপরের সন্তান বললো আর সে উক্ত কথা স্বীকার করে নিল। এটি একটি বড় ধরনের মিথ্যাচার। আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট ও কঠোর মিথ্যাচারের আরেকটি হলো, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক স্বপ্নে এমন কিছু দেখার দাবি করা যা সে মোটেও দেখেনি। আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট ও কঠোর মিথ্যাচারের আরেকটি হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি এমন কোনো কথা, কর্ম ও সমর্থনকে সম্পর্কযুক্ত করা যা তার থেকে পাওয়া যায়নি।
সূত্র
- صحيح البخاري، للإمام محمد بن إسماعيل البخاري، تحقيق محمد الناصر، دار طوق النجاة.
- بهجة الناظرين شرح رياض الصالحين؛ تأليف سليم الهلالي، دار ابن الجوزي- الطبعة الأولى1418ه.
- نزهة المتقين شرح رياض الصالحين؛ تأليف د. مصطفى الخِن وغيره، مؤسسة الرسالة-بيروت، الطبعة الرابعة عشرة، 1407هـ.
- كنوز رياض الصالحين»، لحمد بن ناصر العمار، دار كنوز إشبيليا- الطبعة الأولى1430ه.
- دليل الفالحين لطرق رياض الصالحين، لمحمد علي بن محمد بن علان بن إبراهيم البكري الصديقي الشافعي اعتنى بها: خليل مأمون شيحا، دار المعرفة .
- شرح رياض الصالحين؛ للشيخ محمد بن صالح العثيمين، مدار الوطن، الرياض، 1426هـ.
عن عبد الله بن عمرو رضي الله عنهما أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: «بَلِّغُوا عَنِّي وَلَوْ آيَةً، وَحَدِّثُوا عَنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَا حَرَجَ، وَمَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ».
আব্দুল্লাহ ইবনু ‘আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমার কথা (অন্যদের নিকট) পৌঁছিয়ে দাও, তা যদি একটি মাত্র আয়াতও হয়। বনী ইসরাঈল থেকে (ঘটনা) বর্ণনা কর, তাতে কোন ক্ষতি নেই। কিন্তু যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আমার উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্ধারিত করে নেয়।”
এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন।মানসহীহ
ব্যাখ্যা
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ হাদীসে তাঁর থেকে কুরআন অথবা সুন্নাহর ইলেম (অন্যদের নিকট) পৌঁছিয়ে দেওয়ার আদেশ করেছেন। যদিও তা সামান্য পরিমাণও হয় যেমন আল-কুরআনের একটি আয়াত অথবা একটি হাদীস। তবে শর্ত হলো তিনি যা মানুষের কাছে পৌঁছে দিবে এবং যেদিকে দাওয়াত দিবে সে ব্যাপারে জানতে হবে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন , বনী ইসরাঈল থেকে যেসব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যা আমাদের শরী‘আহর বিরোধী নয়, সেগুলো বর্ণনা করতে কোন ক্ষতি নেই। অতপর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ব্যাপারে মিথ্যা বলতে সাবধান করেছেন। যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর উপর মিথ্যারোপ করল, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।
শিক্ষা
আল্লাহর শরী‘য়তের দাওয়াতের ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। ব্যক্তি যা মুখস্ত করেছে এবং বুঝেছে; তা যদিও সামান্য পরিমাণ হয়, তবুও তা অন্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া দায়িত্ব।
শরীয়তের ইলম তালাশ করা ফরয; যাতে সে আল্লাহর ইবাদত করতে সক্ষম হয় এবং সহীহভাবে তাঁর শরী‘য়তের দাওয়াত পৌঁছাতে পারে।
কোন হাদীস অন্যের কাছে পৌঁছানোর পূর্বে বা তা প্রচারের আগে এর বিশুদ্ধতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া ওয়াজিব; যাতে এ ব্যাপারে আরোপিত কঠোর শাস্তির আওতাভুক্ত না হয়।
কথাবার্তায় সত্য বলা এবং হাদীস বর্ণনায় সতর্কতা অবলম্বন করতে উৎসাহিত করা হয়েছে; যাতে মিথ্যায় পতিত না হয়। বিশেষ করে আল্লাহর শরী‘য়তের ব্যাপারে আরো কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করা।
সূত্র
صحيح البخاري (4/ 170) (3461).
بهجة الناظرين شرح رياض الصالحين، لسليم الهلالي (2/ 464).
نزهة المتقين، لمصطفى الخن وغيره (2/ 951).
شرح رياض الصالحين، لابن عثيمين (5/ 429).
সামুরাহ ইবন জুনদুব ও মুগিরাহ ইবন শুবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তারা উভয়ে বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আমার পক্ষ হতে এমন হাদীস বর্ণনা করে সেটিকে মিথ্যা মনে হয়, সে মিথ্যাবাদীদের একজন”।
(এটি ইমাম মুসলিম সহীহ মুসলিমের ভূমিকায় বর্ণনা করেছেন।)মানসহীহ
ব্যাখ্যা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানান, যে কেউ তাঁর কাছ থেকে একটি হাদীস উদ্ধৃত করে অথচ সে জানে বা মনে করে বা তার ধারনায় প্রবল হয় যে এটি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর মিথ্যা রচনা; এমন অবস্থায় তার বর্ণনাকারী এই মিথ্যাটি রচনাকারীর অংশীদার হবে।
শিক্ষা
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম সূত্রে বর্ণিত হাদীসগুলো প্রচার করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা।
যে মিথ্যা রচনা করেন এবং যে এটিকে বর্ণনা করেন এবং যে এটিকে মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেন সবার ওপর মিথ্যার বিশেষণটি প্রযোজ্য হয়।
যে হাদীসটি বানোয়াট বলে জানেন, অথবা হাদীসটি বানোয়াট হওয়ার ওপর যার প্রবল ধারনা সৃষ্টি হয় তার পক্ষে বানোয়াট হাদীস বর্ণনা করা হারাম, তবে তার বিরুদ্ধে সতর্ক করার জন্য হলে হারাম নয়।
عن المقدام بن معدِيْكَرِب رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «أَلَا هَلْ عَسَى رَجُلٌ يَبْلُغُهُ الْحَدِيثُ عَنِّي وَهُوَ مُتَّكِئٌ عَلَى أَرِيكَتِهِ فَيَقُولُ: بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ كِتَابُ اللهِ، فَمَا وَجَدْنَا فِيهِ حَلَالًا اسْتَحْلَلْنَاهُ، وَمَا وَجَدْنَا فِيهِ حَرَامًا حَرَّمْنَاهُ، وَإِنَّ مَا حَرَّمَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَمَا حَرَّمَ اللهُ».
আল-মিকদাম ইবনু মা‘দী কারিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “সাবধান! অচিরেই এমন ব্যক্তির উদ্ভব হবে যে তার আসনে হেলান দেওয়া অবস্থায় বসে থাকবে এবং তার কাছে আমার থেকে হাদীস পৌঁছালে সে বলবে: আমাদের ও তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাবই রয়েছে। সুতরাং আমরা তাতে যা হালাল পাবো তাকেই হালাল গণ্য করব এবং তাতে যা হারাম পাবো তাকেই হারাম গণ্য করব। জেনে রাখ, প্রকৃত অবস্থা হল এই যে, নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ যা হারাম করেছেন তা আল্লাহ যা হারাম করেছেন তার মতই হারাম।”
এটি আবূ দাঊদ, তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ বর্ণনা করেছেন।মানসহীহ
ব্যাখ্যা
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, এমন একটি যামানা নিকটবর্তী হয়েছে, যে যামানাতে একদল মানুষ একত্রিত হয়ে বসে থাকবে, তাদের মধ্যে একজন তার বিছানাতে হেলান দিয়ে থাকবে, তার কাছে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস পৌঁছালে সে বলবে: আমাদের ও তোমাদের মধ্যে সকল বিষয়ে চুড়ান্ত ফয়সালা করবে আল-কুরআনুল কারীম, আর সেটাই আমাদের জন্য যথেষ্ট। সুতরাং আমরা সেখানে যা হালাল হিসেবে দেখতে পাব, সেগুলোর উপরেই আমল করব, আর যা সেখানে হারাম হিসেবে দেখতে পাব, (শুধু) সেগুলো থেকেই দূরে থাকব। তারপরে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি যে বস্তুগুলো হারাম করেছেন, অথবা যেগুলো থেকে নিষেধ করেছেন, সেগুলোর হুকুম ঠিক আল্লাহ যেগুলো তার কিতাবে হারাম করেছেন, সেগুলোর মতই; কেননা তিনি (রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তার রবের পক্ষ থেকে মুবাল্লিগ (বার্তাবাহক) মাত্র।
শিক্ষা
হাদীসটিতে সুন্নাহকে (হুকুমগত দিক থেকে) মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, যেভাবে কুরআনকে মর্যাদা দেওয়া হয়। কুরআনের মতোই সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা হবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যই আল্লাহর আনুগত্য এবং তার অবাধ্যতাই আল্লাহ তা‘আলার অবাধ্যতা।
সুন্নাহর প্রামাণিকতা সাব্যস্ত এবং যারা সুন্নাহকে প্রত্যাখ্যান করে অথবা তা অস্বীকার করে তাদের জন্য এ হাদীসে রয়েছে অপনোদন ও জবাব।
যে ব্যক্তি সুন্নাহ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় আর কুরআনের উপরে সীমাবদ্ধ থাকার দাবী করে, সে মূলত কুরআন ও সুন্নাহ উভয় থেকেই মুখ ফিরিয়ে নেয়। বস্তুত সে কুরআন অনুসরণের দাবীর ক্ষেত্রে মিথ্যুক।
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওতের দলিলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, ভবিষ্যতে ঘটিতব্য বিষয়ের বর্ণনা প্রদান করা। আর সেগুলো তিনি যে রকম বলেছেন, ঠিক অনুরূপ ঘটা।
সূত্র
سنن أبي داود (7/ 13) (4604)، سنن الترمذي (4/ 399) (2664)، سنن ابن ماجه (1/ 9) (12)، نخب الأفكار في تنقيح مباني الأخبار في شرح معاني الآثار (13/ 154).
عن أبي هريرة رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ».
আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ».
“যে কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যারোপ করলো, সে যেন জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্ধারণ করে নেয়।”
সহীহ বুখারী ও মুসলিমমানসহীহ
ব্যাখ্যা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর উপর কথা বা কাজের মাধ্যমে মিথ্যারোপ করলো, সে যেন আখিরাতে জাহান্নামকেই তার ঠিকানা নির্ধারিত করে নেয়। এটি তার কর্মের প্রতিদান।
শিক্ষা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যারোপ করা জাহান্নামে প্রবেশের কারণ।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর মিথ্যারোপ করা অন্যান্য লোকদের ব্যাপারে মিথ্যারোপের মতো নয়; কেননা এতে দ্বীন ও দুনিয়াতে মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয়।
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে হাদীসটির সম্পৃক্ততা বিশুদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়ে সে হাদীস বর্ণনা করার ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।
সূত্র
صحيح البخاري (1/ 33) (110)، صحيح مسلم (1/ 10) (3)، إكمال المعلم (1/111)، شرح النووي على مسلم (1/65)، المفهم (1/32)، عمدة القاري شرح صحيح البخاري (2/ 151)، شرح مقدمة سنن ابن ماجه (5/ 8).
عن العِرْباضِ بن ساريةَ رضي الله عنه قال: قام فينا رسول الله صلى الله عليه وسلم ذات يوم، فوَعَظَنا مَوعظةً بليغةً وَجِلتْ منها القلوبُ، وذَرَفتْ منها العيونُ، فقيل: يا رسول الله، وعظتَنَا موعظةَ مُودِّعٍ فاعهد إلينا بعهد. فقال: «عليكم بتقوى الله، والسمع والطاعة، وإن عبدًا حبشيًّا، وسترون من بعدي اختلافًا شديدًا، فعليكم بسنتي وسنة الخلفاء الراشدين المهديين، عَضُّوا عليها بالنواجِذ، وإياكم والأمور المحدثات، فإن كل بدعة ضلالة».
ইরবাদ বিন সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে এমন মর্মস্পর্শী বক্তৃতা শুনালেন, তাতে অন্তর ভীত হল এবং চোখ দিয়ে অশ্রু বয়ে গেল। সুতরাং আমরা বললাম: হে আল্লাহর রাসূল! মনে হচ্ছে এ যেন বিদায়ী ভাষণ। তাই আপনি আমাদেরকে অন্তিম উপদেশ দিন। তিনি বললেন:
“আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতি এবং (আমীরের) কথা শোনা ও তার আনুগত্য করার উপদেশ দিচ্ছি; যদিও তোমাদের উপর কোন নিগ্রো দাস আমীর হয়। (স্মরণ রাখ) তোমাদের মধ্যে যে আমার পর জীবিত থাকবে, সে অনেক মতভেদ বা অনৈক্য দেখবে। সুতরাং তোমরা আমার সুন্নাত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতিকে আঁকড়ে ধর এবং তা মাড়ির দাঁত দিয়ে মজবুত করে ধর। আর তোমরা দ্বীনের মধ্যে নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদ‘আত) থেকে বেঁচে থাক। কারণ, প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।”
এটি আবূ দাউদ, তিরমিযী, ইবনে মাজাহ ও আহমাদ বর্ণনা করেছেন।মানসহীহ
ব্যাখ্যা
একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদেরকে এমন মর্মস্পর্শী বক্তৃতা শুনালেন যে, তাতে তাদের অন্তরসমূহ ভীত হলো এবং চোখ দিয়ে অশ্রু সিক্ত হলো। ফলে তারা বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! এ যেন বিদায়ী ভাষণ মনে হচ্ছে। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে ওয়াজে চরম আকারে গুরুত্ব প্রদান করছেন। ফলে তারা তাঁর কাছে অন্তিমকালীন উপদেশ চাইল, যাতে তারা তাঁর মৃত্যুর পরে সেগুলো আঁকড়িয়ে ধরে রাখতে পারেন। তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আমি তোমাদেরকে মহান আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করতে অসিয়াত করছি। আর তা অর্জিত হবে ওয়াজিবসমূহ পালন করা ও হারামসমূহ থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে। এছাড়াও আমি তোমাদেরকে উপদেশ দিচ্ছি (শাসক ও ইমামদের) কথা শোনার ও তার আনুগত্য করার ব্যাপারে; যদিও তোমাদের উপর কোন দাসও আমীর বা শাসক হয়। অর্থাৎ তোমাদের মধ্যকার নিম্নস্তরের কোন লোকও যদি আমীর হয়, তবুও তোমরা তার আনুগত্যে ঘৃণা করো না; বরং তোমরা তার আনুগত্য করো, যাতে ফিতনা ছড়িয়ে না পড়ে। কেননা তোমাদের মধ্যে যে আমার পর জীবিত থাকবে, সে অনেক মতভেদ বা অনৈক্য দেখতে পাবে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিতনা ও মতানৈক্য থেকে বেঁচে থাকার যে পথ দেখিয়েছেন,তা হলো তাঁর সুন্নাত ও তাঁর মৃত্যুর পরে সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা; আর তারা হলেন: আবূ বকর সিদ্দীক, উমার ইবন খাত্তাব, উসমান ইবন আফফান ও আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমা‘ঈন। সেই সুন্নাত মাড়ির দাঁত(শেষ আদরাস দাঁত) দিয়ে মজবুত করে ধারণ করা। অর্থাৎ সুন্নাতের উপর অটল থাকা এবং তা মজবুতভাবে আঁকড়িয়ে ধরা। তিনি দ্বীনের মধ্যে নব উদ্ভাবিত বিষয়সমূহ (বিদ‘আত) থেকে বেঁচে থাকতে সতর্ক করেছেন। কারণ, প্রত্যেক বিদ‘আতই ভ্রষ্টতা।
শিক্ষা
সুন্নাহ আঁকড়িয়ে ধরা এবং এর অনুসরণ করার গুরুত্ব হাদীসটিতে বর্ণিত হয়েছে।
উত্তম নসীহাহ ও অন্তরসমূহ নরমকারী কথার গুরুত্ব এ হাদীসে আলোচনা করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পরে খুলাফায়ে রাশেদীনদের অনুসরণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন: আবূ বকর সিদ্দীক, উমার ইবন খাত্তাব, উসমান ইবন আফফান ও আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
দ্বীনের মধ্যে কোন কিছু আবিষ্কার তথা বিদ‘আত থেকে নিষেধ করা হয়েছে। কেননা প্রত্যেক বিদ‘আতই পথভ্রষ্টতা।
যিনি মুমিনদের কর্তৃত্বের অধিকারী হবেন, ভালো কাজে তার কথা শোনা ও তার আনুগত্য করা।
সর্বদা ও সর্ব অবস্থায় মহান আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন করার গুরুত্ব হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
এ উম্মতের মধ্যে নানা মতানৈতক্য সংঘটিত হবেই, অতএব এসব মতানৈক্যের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ ও খুলাফায়ে রাশেদীনদের সুন্নাহর দিকে ফিরে যাওয়া অত্যবশ্যক।
সূত্র
الأربعون النووية (ص: 89) (ح28)، سنن أبي داود (7/ 16) (4607)، سنن الترمذي (4/ 408) (2676)، سنن ابن ماجه (1/ 28) (42)، مسند أحمد (28/ 367) (17142)، تحفة الأحوذي (7/ 366)، عون المعبود وحاشية ابن القيم (12/ 235)، شرح الأربعين النووية للعثيمين (ص: 278).
আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “শেষ যুগে আমার উম্মতের মধ্যে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে যারা তোমাদের এমন হাদীস শোনাবে যা তোমরা কিংবা তোমাদের পূর্বপুরুষরা কেউ শোনেনি। অতএব তোমরা সাবধান থাকবে এবং তাদেরও সাবধান রাখবে।
ইমাম মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেনমানসহীহ
ব্যাখ্যা
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন, আমার উম্মতের শেষ জমানায় কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটবে যারা মিথ্যা রচনা করবে এবং তারা এমন কথা বলবে যা তাদের পূর্বে কেউ বলেনি। তারা মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীস সম্পর্কে সংবাদ দিবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, আমরা তাদের থেকে দূরে থাকবো এবং তাদের সাথে বসবো না এবং তাদের হাদীস শুনবো না, যেন সেই বানানো হাদীস অন্তরে বদ্ধমূল না হয়ে যায়, যা থেকে মুক্ত হওয়া কঠিন হয়ে যাবে।
শিক্ষা
হাদীসটিতে নবুওয়তের একটি নিদর্শন রয়েছে , পরবর্তীতে যা ঘটবে তার সংবাদ আগেই নবী সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন, বস্তুত যা সংবাদ দিয়েছেন তা ঘটছেও।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ইসলাম ধর্মের ওপর যারা মিথ্যা রচনা করবে তাদের থেকে দূরে থাকতে হবে এবং তাদের মিথ্যা শোনা যাবে না।
বিশুদ্ধতা ও প্রমাণ্যতা যাচাই না করে হাদীস গ্রহণ করা ও প্রচার করা থেকে সতর্ক থাকা জরুরি।
সূত্র
صحيح مسلم (1/ 12) (6)، قرة عين المحتاج في شرح مقدمة صحيح مسلم بن الحجاج (2/ 8).
عن عبدِ الله بن عمرو رضي الله عنهما قال: كنتُ أكتبُ كلَّ شيءٍ أسمعُه من رسولِ الله صلَّى الله عليه وسلم أُريدُ حفْظَه، فنهتْني قريشٌ، وقالوا: أتكْتبُ كلَّ شيءٍ تَسمَعُه من رسول الله صلَّى الله عليه وسلم، ورسولُ الله صلَّى الله عليه وسلم بَشَرٌ يتكلَّمُ في الغضَبِ والرِّضا؟ فأمسَكتُ عن الكتاب، فذكرتُ ذلك لرسول الله صلَّى الله عليه وسلم، فأومأ بإصبَعِه إلى فيه، فقال: «اكتُبْ، فوالذي نفسي بيدِه، ما يَخرُجُ منه إلا حقٌّ».
আব্দুল্লাহ বিন ‘আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যা কিছু শুনতাম তা মনে রাখার স্বার্থে লিখে রাখতাম। কুরাইশরা আমাকে (সবকিছু লিখতে) নিষেধ করলেন এবং বললেন, তুমি কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট থেকে শোনা সবকিছুকেই লিখে রাখো? অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ, রাগ ও শান্ত উভয় অবস্থায় কথা বলে থাকেন। সুতরাং আমি লেখা থেকে বিরত থাকলাম। আমি এটা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উল্লেখ করলাম। তিনি তাঁর আঙ্গুল দিয়ে তাঁর মুখের দিকে ইশারা করে বললেনঃ “তুমি লিখে রাখো, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এ মুখ থেকে সত্য ব্যতীত অন্য কিছু বের হয় না”।
আবু দাউদ এটি বর্ণনা করেছেনমানসহীহ
ব্যাখ্যা
আব্দুল্লাহ বিন আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট যা কিছু শুনতাম তা লিখে রাখতাম যেন লিখার সাহায্যে তা মুখস্থ করতে পারি। কুরাইশদের কিছু লোক আমাকে নিষেধ করলেন এবং বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ রাগ ও শান্ত উভয় অবস্থায় কথা বলে থাকেন, কখনো তিনি ভুল করতে পারেন। সুতরাং আমি লেখা থেকে বিরত থাকলাম।
তারপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরাইশরা যা বলেছে তার সংবাদ দিলাম। তিনি আঙ্গুল দিয়ে তাঁর মুখের দিকে ইশারা করে বললেনঃ তুমি লিখে রাখো, সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এ মুখ থেকে রাগ ও শান্ত সর্বাবস্থায় সত্য ব্যতীত অন্য কিছু বের হয় না।
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেছেন: (তিনি প্রবৃত্তি থেকে বলেন না*, তা তো কেবলই অহী যা তাঁর প্রতি প্রত্যাদেশ করা হয়) [আন-নাজম ৩-৪]।
শিক্ষা
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগ ও শান্ত অবস্থায় যা কিছু তাঁর মহান রবের তরফ থেকে প্রচার করেন তাতে তিনি নির্ভুল থাকেন।
সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমের সুন্নাহ মুখস্থ করা ও তা প্রচার করার প্রতি গভীর আগ্রহ।
বিশেষ প্রয়োজনে, কসম তলব করা ছাড়াও কসম করা বৈধ, যেমন কোনো বিষয়ের গুরুত্ব বোঝাতে কসম করা।
ইলম সংরক্ষণ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো ইলম লিপিবদ্ধ করে রাখা।
সূত্র
سنن أبي داود (5/ 489) (3646)، شرح سنن أبي داود للعباد (412/ 21).
এখানকার প্রতিটি হাদীস, মান, ব্যাখ্যা ও শিক্ষা HadeethEnc.com যেভাবে প্রকাশ করে হুবহু সেভাবেই দেখানো, তাদের পুনঃপ্রকাশের শর্ত মেনে। মানের সঙ্গে মান-নির্ধারকের নাম নেই। অনুবাদ ও ব্যাখ্যা এর লেখকদের নিজস্ব, এবং কোনো কোনোটিতে বিধান বলা আছে; সাবীলের পর্যালোচকেরা এগুলো যাচাই করেননি। আরবি হাদীসটিই মূল পাঠ। উৎস: HadeethEnc.com