রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সালাতে দাঁড়াতেন তখন বলতেন, আমি ইবাদতের সাথে একনিষ্ঠ হলাম, এই অর্থে যে, আমি আমার সকল ইবাদত একনিষ্ঠ করলাম আল্লাহর জন্য যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, যার কোনো দৃষ্টান্ত পূর্বে ছিল না। তিনি ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। কারণ, যে সত্ত্বা এ ধরনের সৃষ্টি আবিষ্কার করেছেন, যা সম্পূর্ণই নতুন এবং খুব মজবুত, সকল চেহারার তার দিকেই মনোনিবেশ করা উচিৎ এবং অন্তর সমূহের সর্বাবস্থায় তাঁর ওপরই ভরসা করা উচিৎ। তিনি ছাড়া অন্য কারো দিকে মনোনিবেশ করা উচিৎ নয়। এবং তার স্থায়ী সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ আশা করা। “সব বাতিল দীন থেকে মুখ ফিরিয়ে সত্য দীন ইসলামের দিকে মনোনিবেশ করলাম তার ওপরই প্রতিষ্ঠিত থেকে।” আরবদের নিকট “হানীফ” বলতে থাকেই বুঝানো হত যে ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর থাকত। তারপর তিনি বলেন, ‘আমার সালাত, যাবতীয় ইবাদত ও নৈকট্য অর্জন করার প্রচেষ্টাসমূহ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর সন্তুষ্ঠির জন্য উৎসর্গ। এ বিষয়ে তার সাথে অন্য কাউকে শরীক করব না। অনুরূপভাবে আমার হায়াত ও মৃত্যু আল্লাহর জন্য। তিনি তাদের স্রষ্টা ও নির্ণয়ক। এতে তিনি ছাড়া কারো কোনো দখল নেই। তার সত্ত্বা, গুণাবলি ও কর্মসমূহে তার কোনো শরীক নয়। তিনিই আমাকে এই তাওহীদ ও ইখলাসের নির্দেশ দিয়েছেন। আর আমি তারই অনুগত ও অনুসারী মুসলিমদের একজন’। তারপর বলেন, ‘হে আল্লাহ! তুমিই মালিক। তুমি ছাড়া আর কোনো মালিক নেই। তুমি ছাড়া আর কারো জন্যেই প্রকৃত কোনো রাজত্ব নেই। ইলাহ হিসেবে তুমি একক। তুমি ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ বা উপাস্য নেই। তুমিই আমার রব, আর আমি তোমার বান্দা। গুনাহ ও অন্যায় এবং তোমার স্মরণ থেকে বিমুখ হয়ে আমি আমার নিজের ওপর অত্যাচার করেছি। আর আমি স্বীকার করছি আমার অপরাধ। তুমি আমার অপরাধ ক্ষমা কর, তুমি ছাড়া আর কেউ অপরাধ ক্ষমা করার নেই। কারণ, তুমিই ক্ষমাকারী ও গাফূর’। তারপর বলেন, ‘আপনি আমাকে আপনার ইবাদত ও অন্যান্যা সবকিছুতে বাহ্যিক ও গোপনীয় যাবতীয় সুন্দর ও পাক-পবিত্র চরিত্রের পথ দেখান, সুন্দর চরিত্র অবলম্বন করার তাওফীক দান করুন এবং তার ওপর অবিচল রাখুন। কারণ, আপনিই তার পথপ্রদর্শক। আপনি ছাড়া আর কেউ পথপ্রদর্শক নেই। আপনি আমাকে খারাপ চরিত্রগুলো থেকে দূরে রাখুন এবং হিফাযত করুন। কারণ, আপনি ছাড়া আর তা থেকে দূরে রাখা বা হিফাযত করার কেউ নেই’। তারপর তিনি বলেন, ‘আপনার আনুগত্যের ওপর সর্বদাই টিকে থাকবো। আর আপনার ডাকে সাড়া দেওয়ার মাধ্যমে এবং আপনার আনুগত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকার মাধ্যমে একের পর এক সৌভাগ লাভ করে যাব’। তারপর তিনি বলেন, যাবতীয় কল্যাণ আপনার নিয়ন্ত্রণে। আপনিই তার অধিপতি এবং আপনি যেভাবে চান সেভাবে পরিচালনা করেন। মন্দ সংঘটিত হয় আপনার কৃত ও সৃষ্ট বস্তুতে, আপনার কর্মে নয়’। সুতরাং মন্দকে কোনো ক্রমেই তার দিকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। না তার সত্ত্বা ও সিফাতের সাথে, আর না তার কর্ম ও নামসমূহের সাথে। কারণ, তার সত্ত্বা সর্বদিক থেকে পরিপূর্ণ। আর তার সিফাতও পরিপূর্ণ যার ওপর তার শুকরিয়া ও প্রসংশা করা হয়। আর তার কর্মসমূহ সবই কল্যাণ, রহমত, ইনসাফ ও হিকমতপূর্ণ। কোনো ক্রমেই তার কর্মসমূহের মধ্যে কোনো অকল্যাণ নেই। তার নামসমূহ সবই সুন্দর। ফলে তার দিকে কীভাবে খারাপ কর্মকে সম্পৃক্ত করা যাবে। বরং খারাপ কর্মতো তার সৃষ্টি ও মাখলুকাতের মধ্যে বিদ্যমান। আর তারা আল্লাহ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ, তার কর্ম তার কৃতের থেকে আলাদা। ফলে তার কর্ম সবই কল্যাণ। তবে তার মাখলুক ও তার কৃতের মধ্যে কল্যাণ ও অকল্যাণ দু’টিই রয়েছে। সুতরাং যেহেতু খারাপ কর্মসমূহ মাখলুক যা তার থেকে আলাদা -মহান রবের সাথে স্থাপিত নয়, তাই তা তার সাথে সম্পৃক্ত করা যাবে না। এ কথার মধ্যে মু‘তাযিলা সম্প্রদায় যারা বিশ্বাস করে যে, আল্লাহ খারাপ কর্মসমূহের স্রষ্টা নন, তাদের বিশ্বাসের পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই। কারণ, আল্লাহ ভালো ও খারাপ যাবতীয় কর্মের স্রষ্টা। আর তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা। আপনার দ্বারাই আশ্রয় চাই, আপনার ওপর ভরসা করি, আপনার দ্বারাই প্রতিষ্ঠিত আছি। আর আপনার দিকেই আমার আশ্রয়, আপনার দিকেই ফিরে যাওয়া এবং আপনার দিকেই মুখ করা। অথবা অর্থ হলো আপনাকেই একক জানি, আমার যাবতীয় কর্ম আপনাতে সমাপ্ত হয়। আপনিই শুরু আবার আপিনিই শেষ। আবার কেউ বলেন, আপনার মাধ্যমেই সাহায্য চাই এবং আপনার দিকেই আমার ফিরে যাওয়া। আপনার বরকত মহান, সম্মানিত ও সংখ্যায় অনেক। চিন্তাগুলো যতটুকু চিন্তা করে এবং বিবেক যতটুকু ধারণা করে আপনি তার চেয়েও উর্ধ্বে। আপনি সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র। আমি আপনার নিকট পূর্বের পাপের ক্ষমা চাই এবং যেসব পাপ বাকি আছে সেগুলো থেকে ফিরে আসছি, এবং আপনার তাওফীক ও দৃঢ়তায় মৃত্যু পর্যন্ত আপনার দিকেই মনোনিবেশ করব। আর যখন রুকু করেন তখন বলতেন, ‘আমার রুকু একমাত্র আপনার জন্যেই, আমি আপনার ওপর ঈমান এনেছি এবং আপনার কাছেই আত্মসমর্পণ করেছি। আমি এবং আমার সকল অঙ্গ, যেমন কান, চোখ, মস্তিষ্ক, হাড়, পেশী, সবই আপনার নির্দেশের জন্যে বিনয়াবনত’। আর যখন রুকু থেকে মাথা তুলেন তখন বলেন, ‘আমি আপনার এমন প্রশংসা করছি যে, সেটা যদি শরীরের আকৃতি ধারণ করত তাহলে সকল আসমান ও যমীন পূর্ণ করে নিত, এবং আসমান ও যমীনের পর যা চাইত সেটাও পূর্ণ করে নিত’। আর যখন সাজদাহ করেন তখন বলেন, ‘আমার মুখমণ্ডল সাজদায় অবনত সেই মহান সত্ত্বার জন্য, যিনি একে সৃষ্টি করেছেন এবং আকৃতি দিয়েছেন, আর তার কান ও চোখ বিদীর্ণ করেছেন। সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ অত্যন্ত বরকতময়’। তারপর সালাম ও তাশাহ্হুদের মাঝখানে সর্বশেষ বলতেন, “হে আল্লাহ! ক্ষমা করে দিন আমার গুনাহসমূহ- যা পূর্বে করেছি, যা পরে করেছি, অর্থাৎ যেন সে বলল, হে আল্লাহ আমার নতুন ও পুরাতন পাপগুলো মাফ করুন”। ‘যা আমি গোপনে করেছি এবং যা প্রকাশ্যে করেছি এবং যা আমার নফস বলেছে এবং যা জবান উচ্চারণ করেছে সব আপনি ক্ষমা করুন। যে পাপ ও অন্যায় করে আমি সীমালঙ্ঘন করেছি, সেগুলো মাফ করে দিন। আমার সেসব মাফগুলো ক্ষমা করুন, যেগুলো আমি জানি না। আর যা আপনি আমার চেয়ে বেশি জানেন। আপনি যাকে চান আপনার আনুগত্য দ্বারা অগ্রগামী করেন এবং আপনি যাকে চান তার থেকে পিছিয়ে রাখেন। আপনি ব্যতীত আর কোনো সত্য ইলাহ নেই’।
صحيح مسلم، تحقيق: محمد فؤاد عبد الباقي، نشر: دار إحياء التراث العربي – بيروت. مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح، لعلي بن سلطان الملا الهروي القاري، الناشر: دار الفكر، بيروت – لبنان، الطبعة: الأولى، 1422هـ - 2002م. كشف المشكل من حديث الصحيحين، لجمال الدين أبي الفرج عبد الرحمن بن علي بن محمد الجوزي، المحقق: علي حسين البواب، الناشر: دار الوطن – الرياض. المنهاج شرح صحيح مسلم بن الحجاج، للنووي، نشر: دار إحياء التراث العربي – بيروت، الطبعة: الثانية، 1392ه. حادي الأرواح إلى بلاد الأفراح، لمحمد بن أبي بكر بن أيوب بن سعد شمس الدين ابن قيم الجوزية، الناشر: مطبعة المدني، القاهرة. نيل الأوطار، لمحمد بن علي بن محمد بن عبد الله الشوكاني اليمني، تحقيق: عصام الدين الصبابطي، الناشر: دار الحديث، مصر، الطبعة: الأولى، 1413هـ - 1993م. صفات الله عز وجل الواردة في الكتاب والسنة : علوي بن عبد القادر السَّقَّاف دار الهجرة الطبعة: الثالثة ، 1426 هـ - 2006 م.