پرش به محتوا
Tafseer ibn Kathir · Az-Zumar
سورهٔ ۳۹

Az-Zumar

این تفسیری به زبانی غیر از عربی است، همان‌گونه که در Quranic Universal Library (QUL، از Tarteel) آمده و از نسخهٔ باز داده‌های QUL گرفته شده که spa5k/tafsir_api نگه می‌دارد. اطلاعات ثبت‌شدهٔ QUL نمی‌گوید چه کسی آن را نوشته یا ترجمه کرده و از کدام چاپ پیروی می‌کند، و برای متن مجوزی بیان نمی‌کند، پس حق نمایش آن تأیید نشده است. کسی آن را با کتاب چاپی مقایسه نکرده و عالمی آن را بررسی نکرده است. هر بخش در کنار آیه‌هایی آمده که دربارهٔ آن‌ها توضیح می‌دهد و این آیه‌ها متن قرآن از Tanzil است، همان‌گونه که آنجا هست. سبیل چیزی از آن را ننوشته و ترجمه نکرده است.

متن ازQuranic Universal Libraryspa5k/tafsir_apiMITبرداشته‌شده در 2026-10-21

آیه‌های ۵۳–۵۹

قُلْ يَـٰعِبَادِىَ ٱلَّذِينَ أَسْرَفُوا۟ عَلَىٰٓ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا۟ مِن رَّحْمَةِ ٱللَّهِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يَغْفِرُ ٱلذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُۥ هُوَ ٱلْغَفُورُ ٱلرَّحِيمُ ۵۳ وَأَنِيبُوٓا۟ إِلَىٰ رَبِّكُمْ وَأَسْلِمُوا۟ لَهُۥ مِن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ ٱلْعَذَابُ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ ۵۴ وَٱتَّبِعُوٓا۟ أَحْسَنَ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُم مِّن قَبْلِ أَن يَأْتِيَكُمُ ٱلْعَذَابُ بَغْتَةً وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ ۵۵ أَن تَقُولَ نَفْسٌ يَـٰحَسْرَتَىٰ عَلَىٰ مَا فَرَّطتُ فِى جَنۢبِ ٱللَّهِ وَإِن كُنتُ لَمِنَ ٱلسَّـٰخِرِينَ ۵۶ أَوْ تَقُولَ لَوْ أَنَّ ٱللَّهَ هَدَىٰنِى لَكُنتُ مِنَ ٱلْمُتَّقِينَ ۵۷ أَوْ تَقُولَ حِينَ تَرَى ٱلْعَذَابَ لَوْ أَنَّ لِى كَرَّةً فَأَكُونَ مِنَ ٱلْمُحْسِنِينَ ۵۸ بَلَىٰ قَدْ جَآءَتْكَ ءَايَـٰتِى فَكَذَّبْتَ بِهَا وَٱسْتَكْبَرْتَ وَكُنتَ مِنَ ٱلْكَـٰفِرِينَ ۵۹

৫৩-৫৯ নং আয়াতের তাফসীর: এই পবিত্র আয়াতে সমস্ত নাফরমান ও অবাধ্যকে তাওবার দাওয়াত দেয়া হয়েছে যদিও তারা মুশরিক ও কাফিরও হয়। বলা হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল ও দয়ালু। তিনি প্রত্যেক তাওবাকারীর তাওবা কবূল করে থাকেন। যে তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয় তার দিকে মনোযোগ দেন। তাওবাকারীর পূর্বের পাপরাশিও তিনি মার্জনা করে দেন, ওগুলো যেমনই হোক না কেন এবং যত বেশীই হোক না কেন। বিনা তাওবায় পাপরাশি ক্ষমা করে দেয়া এই আয়াতের অর্থ নেয়া ঠিক নয়। কেননা, বিনা তাওবায় শিরকের গুনাহ কখনো মাফ হয় না।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, এমন কতকগুলো মুশরিক হযরত মুহাম্মাদ (সঃ)-এর নিকট আগমন করে যারা বহু হত্যাকার্যে জড়িত ছিল এবং বহুবার ব্যভিচার করেছিল, তারা বলেঃ “আপনি যা কিছু বলেন এবং যে দিকে আহ্বান করেন তা বাস্তবিকই খুবই উত্তম। এখন বলুন, আমরা যেসব পাপকার্য করেছি তার কাফফারা কিভাবে হতে পারে?” তখন নিম্নের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হয়ঃ (আরবী) অর্থাৎ “এবং যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন মাবুদকে ডাকে না। আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না এবং ব্যভিচার করে না।” (২৫:৬৮) (আরবী) অর্থাৎ ‘বলঃ (আমার একথা) হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ- আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না।” (এ হাদীসটি ইমাম বুখারী (রঃ), ইমাম মুসলিম (রঃ), ইমাম আবু দাউদ (রঃ) এবং ইমাম নাসাঈ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত সাওবান (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “সারা দুনিয়া এবং এর মধ্যে যত কিছু রয়েছে সবই আমি লাভ করলেও ততো খুশী হতাম না যতো খুশী হয়েছি। (আরবী)-এ আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার কারণে। তখন একটি লোক প্রশ্ন করলোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! যে ব্যক্তি শিরক করেছে (তারও গুনাহ কি মাফ করে দেয়া হবে)?” রাসূলুল্লাহ (সঃ) কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর বললেনঃ “জেনে রেখো যে, যে ব্যক্তি শিরকও করেছে (তারও গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে যদি সে তাওবা করে)।” তিনি এ কথা তিনবার বললেন। (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আমর ইবনে আমবাসা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, একটি অতি বৃদ্ধ লোক তার লাঠির উপর ভর করে নবী (সঃ)-এর নিকট আসলো এবং বললোঃ “হে আল্লাহর রাসূল (সঃ)! আমার বহু ছোট-বড় গুনাহ রয়েছে। আমাকে ক্ষমা করা হবে কি?” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বলেনঃ “আল্লাহ ছাড়া কোন মা'বুদ নেই। এ সাক্ষ্য কি তুমি দাও না?” জবাবে লোকটি বলেঃ “হ্যা, অবশ্যই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল।” তখন রাসূলুল্লাহ (সঃ) তাকে বললেনঃ “তোমার ছোট বড় সব গুনাহই মাফ করে দেয়া হবে।” (এ হাদীসটিও ইমাম আহমাদ বর্ণনা করেছেন)হযরত আসমা বিনতু ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে (আরবী)-এ আয়াতটিকে এই ভাবে এবং (আরবী) এ আয়াতটিকে এই ভাবে পড়তে শুনেছেন। সুতরাং এসব হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হচ্ছে যে, তাওবা দ্বারা সব গুনাহই মাফ হয়ে যায়। কাজেই বান্দাদের আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ হওয়া উচিত নয়, গুনাহ যতই বড় ও বেশী হোক না কেন। তাওবা ও রহমতের দর সদা খোলা রয়েছে এবং ওগুলো খুবই প্রশস্ত। মহান আল্লাহ বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি জানে না যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করে থাকেন?" (৯:১০৪) অন্য এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যে মন্দ কাজ করে অথবা নিজের উপর যুলুম করে, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করে সে আল্লাহকে ক্ষমাশীল, দয়ালু পেয়ে থাকে।” (৪:১১০) মহামহিমান্বিত আল্লাহ মুনাফিকদের সম্পর্কে বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “নিশ্চয়ই মুনাফিকরা জাহান্নামের অতি নিম্নস্তরে থাকবে এবং তুমি তাদের জন্যে কখনো কোন সাহায্যকারী পাবে না, কিন্তু তাদের কথা স্বতন্ত্র যারা তাওবা করে সংশোধিত হয়।” (৪:১৪৫-১৪৬) মহান আল্লাহ আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “অবশ্যই তারা কুফরী করেছে যারা বলেছে আল্লাহ তিনজনের একজন, অথচ এক মা’রূদ ছাড়া তো আর কোন মা'বূদ নেই, যদি তারা বিরত না হয় যা বলছে তা হতে তবে অবশ্যই কাফিরদেরকে বেদনাদায়ক শাস্তি স্পর্শ করবে।” (৫:৭৩) মহামহিমান্বিত আল্লাহ আরো বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “তারা কি আল্লাহর নিকট তাওবা করবে না এবং তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না, অথচ আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু?" (৫:৭৪) আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তা'আলা আর এক জায়গায় বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “যারা বিশ্বাসী নর-নারীকে বিপদাপন্ন করেছে এবং পরে তাওবা করেনি তাদের জন্যে আছে জাহান্নামের শাস্তি, আছে দহন যন্ত্রণা।” (৮৫:১০) হযরত হাসান বসরী (রঃ) বলেনঃ “আল্লাহর অসীম দয়া ও মেহেরবানীর প্রতি লক্ষ্য করুন যে, তিনি তাঁর বন্ধুদের ঘাতকদেরকেও তাওবা ও ক্ষমা প্রার্থনার দিকে আহ্বান করছেন!সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে ঐ ব্যক্তির ঘটনা সম্পর্কীয় হাদীসটিও বর্ণিত আছে যে নিরানব্বইটি লোককে হত্যা করেছিল, অতঃপর লজ্জিত হয়ে বানী ইসরাঈলের একজন আবেদকে জিজ্ঞেস করেছিল যে, তার জন্যে তাওবার কোন পথ আছে কি না। আবেদ উত্তর দেনঃ “না (তার জন্যে তাওবার আর কোন ব্যবস্থা নেই)। লোকটি তখন ঐ আবেদকেও হত্যা করে ফেলে এবং একশ পূর্ণ করে। অতঃপর তার জন্যে তাওবার কোন ব্যবস্থা আছে কি-না তা সে একজন আলেমকে জিজ্ঞেস করে। আলেম উত্তরে তাকে বলেনঃ “তোমার এবং তোমার তাওবার মাঝে কোন প্রতিবন্ধকতা নেই। তারপর ঐ আলেম লোকটিকে এমন একটি গ্রামে যেতে বলেন যে গ্রামের লোকেরা আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন থাকে। সুতরাং সে ঐ গ্রামের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেল। কিন্তু পথিমধ্যে সে মৃত্যুমুখে পতিত হলো। তখন তার ব্যাপারে রহমতের ও আযাবের ফেরেশতাদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে গেল। মহামহিমান্বিত আল্লাহ তখন যমীনকে মাপার হুকুম করলেন। তখন দেখা গেল যে, যে সৎ লোকদের গ্রামে সে হিজরত করে যাচ্ছিল সেটা কণিষ্ঠাঙ্গুলী পরিমিত স্থান কাছে হলো। তখন তাকে তাদেরই সাথে মিলিয়ে নেয়া হলো এবং রহমতের ফেরেশতারা তার রূহ নিয়ে চলে গেলেন। এও বর্ণিত আছে। যে, মৃত্যুর সময় সে বুকের ভরে হেঁচড় দিয়ে চলছিল। এও আছে যে, আল্লাহ তাআলা সৎ লোকদের গ্রামটিকে নিকটবর্তী হওয়ার এবং মন্দ লোকদের গ্রামটিকে দূরে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। যেখান হতে সে হিজরত করেছিল।হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) এ আয়াতের তাফসীরে বলেন যে, মহান আল্লাহ তাঁর সমস্ত বান্দাকে স্বীয় ক্ষমার দিকে ডাক দিয়েছেন। তাদেরকেও, যারা হযরত মসীহ (আঃ)-কে আল্লাহ বলতো, তাদেরকেও, যারা তাঁকে আল্লাহর পুত্র বলতো, তাদেরকেও, যারা হযরত উযায়ের (আঃ)-কে আল্লাহর পুত্র বলতো, তাদেরকেও, যারা আল্লাহকে দরিদ্র বলতো, তাদেরকেও, যারা আল্লাহর হাতকে বন্ধ বলতো এবং তাদেরকেও, যারা আল্লাহকে তিন খোদার এক খোদা বলতো। মহামহিমান্বিত আল্লাহ এসব লোকের সম্পর্কে বলেন যে, কেন তারা আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়ে না এবং কেন তারা তাঁর কাছে নিজেদের পাপের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করে না? আল্লাহ তা'আলা তো বড় ক্ষমাশীল এবং পরম দয়ালু। অতঃপর মহান আল্লাহ এমন ব্যক্তিকেও তাওবার দিকে আহ্বান করেছেন যার কথা এদের চাইতেও বড় ও মারাত্মক ছিল। যে বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি তোমাদের বড় প্রভু।”(৭৯:২৪) যে আরো বলেছিলঃ (আরবী) অর্থাৎ “আমি ছাড়া তোমাদের যে কোন মাবুদ আছে তা আমার জানা নেই। (২৮:৩৮) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, এর পরেও যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার বান্দাদেরকে তাওবা হতে নিরাশ করে সে মহামহিমান্বিত আল্লাহর কিতাবকে অস্বীকারকারী। কিন্তু এটা বুঝে নেয়া দরকার যে, যে পর্যন্ত আল্লাহ কোন বান্দার দিকে মেহেরবানী করে না ফিরেন সে পর্যন্ত সে তাওবা করার সৌভাগ্য লাভ করে না।হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) বর্ণনা করেছেন যে, কুরআন কারীমের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াত হচ্ছে আয়াতুল কুরসী। ভাল ও মন্দের সর্বাপেক্ষা ব্যাপক আয়াত হলো ... (আরবী) (১৬:৯০)-এ আয়াতটি। কুরআন মাজীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশী খুশীর আয়াত হলো -এর -এ আয়াতটি। সবচেয়ে উৎসাহ ব্যঞ্জক আয়াত হলো (আরবী) এর (আরবী) এই আয়াতটি। অর্থাৎ “যে আল্লাহকে ভয় করে স্বয়ং আল্লাহ তার মুক্তির ব্যবস্থা করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা হতে রিযক দান করেন যা সে কল্পনাও করে না।” (৬৫:২-৩) এ কথা শুনে হযরত মাসরূক (রঃ) তাঁকে বলেনঃ “নিশ্চয়ই আপনি সত্যবাদী।” (এটা ইমাম তিবরানী (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) একদা একজন বক্তার পার্শ্ব দিয়ে গমন করছিলেন যিনি লোকদেরকে উপদেশ দিচ্ছিলেন। তখন হযরত ইবনে মাসউদ (রাঃ) ঐ বক্তাকে বলেনঃ “হে উপদেশদাতা! তুমি জনগণকে আল্লাহর রহমত হতে নিরাশ করছো কেন?” অতঃপর তিনি (আরবী)-এ আয়াতটি পাঠ করেন। (এটা ইমাম ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন) যে হাদীসগুলোতে নৈরাশ্যের অস্বীকৃতি রয়েছে সেগুলোর বর্ণনাঃ হযরত আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছেনঃ “যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমাদের পাপরাশিতে যদি আসমান ও যমীন পূর্ণ হয়ে যায়, অতঃপর তোমরা আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর তবে অবশ্যই আল্লাহ তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। যাঁর হাতে মুহাম্মাদ (সঃ)-এর প্রাণ রয়েছে তাঁর শপথ! তোমরা যদি পাপই না করতে তবে মহামহিমান্বিত আল্লাহ তোমাদেরকে সরিয়ে দিয়ে তোমাদের স্থলে এমন সম্প্রদায়কে আনয়ন করতেন যারা পাপ করতো, অতঃপর আল্লাহ তা'আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতো, তখন আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবু আইয়ুব আনসারী (রাঃ) মৃত্যুর সম্মুখীন অবস্থায় (জনগণকে) বলেন, একটি হাদীস আমি তোমাদের হতে গোপন রেখেছিলাম (আজ আমি তা বর্ণনা করছি)। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছিঃ “তোমরা যদি পাপ না করতে তবে মহামহিমান্বিত আল্লাহ এমন এক কওমকে সৃষ্টি করতেন যারা পাপ করতো এবং আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করতেন।” (এ হাদীসটিও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হয়েছে)হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “গুনাহর কাফফারা হচ্ছে লজ্জা ও অনুতাপ (গুনাহ করার পর লজ্জিত ও অনুতপ্ত হলে আল্লাহ ঐ গুনাহ মাফ করে থাকেন)।" রাসূলুল্লাহ্ (সঃ) আরো বলেনঃ “তোমরা গুনাহ না করলে আল্লাহ এমন সম্প্রদায় আনয়ন করতেন যারা গুনাহ করতো এবং তিনি তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন।" (ইমাম আহমাদ (রঃ) এ হাদীসটিও স্বীয় মুসনাদে বর্ণনা করেছেন)হযরত আলী ইবনে আবি তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “আল্লাহ তা'আলা দৃঢ় বিশ্বাস পোষণকারী ও তাওবাকারী বান্দাকে ভালবাসেন।” (এ হাদীসটি আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উবায়েদ ইবনে উমায়ের (রাঃ) বলেন যে, অভিশপ্ত ইবলীস বলেঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমাকে আদম (আঃ)-এর কারণে জান্নাত হতে বের করে দিয়েছেন এবং আপনি আমাকে তার উপর জয়যুক্ত না করলে আমি তার উপর জয়যুক্ত হতে পারি না।" তখন আল্লাহ তাআলা বললেনঃ “যাও, তার উপর প্রভাব বিস্তার করার ক্ষমতা আমি তোমাকে প্রদান করলাম।” সে বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আরো বেশী করুন।” মহান আল্লাহ বলেনঃ “যাও, আদম (আঃ)-এর যতগুলো সন্তান জন্মগ্রহণ করবে, তোমারও ততগুলো সন্তান জন্মলাভ করবে।" সে আবারও বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আরো বেশী করুন।” মহান আল্লাহ বললেনঃ “আদম সন্তানের বক্ষে আমি তোমার বাসস্থান বানিয়ে দিবো এবং তুমি তাদের দেহের মধ্যে রক্তের জায়গায় চলাফেরা করবে।” সে বললোঃ “হে আমার প্রতিপালক! আরো বেশী কিছু দান করুন। আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “যাও, তুমি তাদের উপর তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য ছাড়বে, তাদের ধন-মালে ও সন্তান-সন্ততিতে অংশীদার হবে এবং তাদের সাথে ওয়াদা অঙ্গীকার করবে। আর তাদের সাথে তোমার ওয়াদা অঙ্গীকার তো প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।” ঐ সময় হযরত আদম (আঃ) দুআ করলেনঃ “হে আমার প্রতিপালক! আপনি শয়তানকে আমার উপর ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি দান করলেন। এখন আমি তার প্রভাব থেকে বাঁচতে পারি না যদি না আপনি বাচান।” তখন আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “জেনে রেখো যে, তোমার যতগুলো সন্তান হবে তাদের প্রত্যেকের সাথে আমি একজন রক্ষক নিযুক্ত করবো। সে শয়তানের ছোবল থেকে তাকে রক্ষা করবে।” হযরত আদম (আঃ) আরো কিছু বেশী চাইলে আল্লাহ তা'আলা বললেনঃ “একটি পুণ্যকে আমি দশটি করে দিবো, বরং তার চেয়েও বেশী করবো। আর পাপ একটির বদলে একটিই থাকবে অথবা সেটাও আমি মাফ করে দিবো।” হযরত আদম (আঃ) এর পরেও প্রার্থনা করতে থাকলে মহান আল্লাহ বলেনঃ “তাওবার দর তোমাদের জন্য ঐ পর্যন্ত ভোলা থাকবে যে পর্যন্ত তোমাদের দেহে প্রাণ থাকবে।” হযরত আদম (আঃ) আরো বেশী চাইলে আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ (আরবী) অর্থাৎ “হে আমার বান্দারা! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছে আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না, আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দিবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (এ হাদীসটি ইবনে আবি হাতিম (রঃ) বর্ণনা করেছেন)হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ যেসব লোক দুর্বলতাবশতঃ কাফিরদের দেয়া কষ্ট সহ্য করতে না পারার কারণে নিজেদের দ্বীনের ব্যাপারে ফিতায় পড়ে গিয়েছিল তাদের ব্যাপারে আমরা পরস্পর বলাবলি করতাম যে, আল্লাহ তা'আলা তাদের কোন পুণ্য এবং তাওবা হয়তো কবুল করবেন না। কেননা, তারা আল্লাহ তা'আলার পরিচয় লাভ করার পর আবার কুফরী করতে শুরু করেছে এবং কাফিরদের উৎপীড়ন সহ্য করতে পারেনি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সঃ) যখন মদীনায় আগমন করেন তখন আল্লাহ তা'আলা ঐ লোকদের ব্যাপারে আমাদের এই উক্তিটিকে খণ্ডন করে (আরবী) হতে (আরবী) পর্যন্ত আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেন।হযরত উমার (রাঃ) বলেনঃ আমি স্বহস্তে এই আয়াতগুলো লিখে হযরত হিশাম ইবনে আস (রাঃ)-এর নিকট পাঠিয়ে দিই। হযরত হিশাম (রাঃ) বলেনঃ আমি এ সময় যীতওয়া নামক স্থানে অবস্থান করছিলাম এবং এই আয়াতগুলো বারবার পাঠ করছিলাম এবং খুবই চিন্তা-গবেষণা করছিলাম কিন্তু কোনক্রমেই এগুলোর ভাবার্থ আমার বোধগম্য হচ্ছিল না। তখন আমি দু'আ করলামঃ হে আমার প্রতিপালক! এই আয়াতগুলোর সঠিক মতলব এবং এগুলো আমার কাছে প্রেরণের আসল উদ্দেশ্য আমার কাছে প্রকাশ করে দিন। তখন মহান আল্লাহর পক্ষ হতে আমার অন্তরে এ বিশ্বাস জন্মিয়ে দেয়া হলো যে, এ আয়াতগুলো আমাদের উদ্দেশ্যেই অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস হয় যে, এখন আমাদের তাওবা কবুল হতে পারে। এ ব্যাপারেই মহামহিমান্বিত আল্লাহ এ আয়াতগুলো অবতীর্ণ করেছেন। তৎক্ষণাৎ আমি আমার উটের উপর সওয়ার হয়ে মদীনার পথে যাত্রা শুরু করি এবং রাসূলুল্লাহ (সঃ)-এর খিদমতে হাযির হই। (এটা মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (রাঃ) বর্ণনা করেছেন)বান্দাদের নৈরাশ্যকে ভেঙ্গে দিয়ে তাদের ক্ষমা করে দেয়ার আশা প্রদান করে মহান আল্লাহ তাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন তাওবা ও সৎ কাজের দিকে তাড়াতাড়ি এগিয়ে যায়, এতে যেন মোটেই বিলম্ব না করে। এমন যেন না হয় যে, আল্লাহর আযাব এসে পড়ে, যে সময় কারো কোন সাহায্য কাজে আসবে।অতঃপর মহান আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের প্রতি তোমাদের প্রতিপালকের নিকট হতে উত্তম যা অবতীর্ণ হয়েছে অর্থাৎ আল-কুরআন, তার তোমরা অনুসরণ কর, তোমাদের উপর অতর্কিতভাবে তোমাদের অজ্ঞাতসারে শাস্তি আসার পূর্বে, যাতে কাউকেও বলতে না হয়ঃ হায়! আল্লাহর প্রতি আমার কর্তব্যে আমি যে অবহেলা করেছি তার জন্যে আফসোস! যদি আমি আন্তরিকতার সাথে আল্লাহর আদেশ ও নিষেধ মেনে চলতাম তাহলে কতই না ভাল হতো! হায়! আমি তো বেঈমানই ছিলাম! মহান আল্লাহর বাণীর উপর আমি বিশ্বাস স্থাপন করিনি, বরং তা হাসি-ঠাট্টা করে উড়িয়ে দিয়েছিলাম।মহান আল্লাহ বলেনঃ কাউকেও যেন বলতে না হয়ঃ আল্লাহ আমাকে পথ প্রদর্শন করলে অবশ্যই আমি মুত্তাকীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম এবং দুনিয়ায় আল্লাহর নাফরমানী হতে এবং আখিরাতে তাঁর আযাব হতে বেঁচে যেতাম। অথবা শাস্তি প্রত্যক্ষ করলে যেন কাউকে বলতে না হয়ঃ আহা! যদি পুনরায় আমাকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে দেয়া হতো তবে আমি অবশ্যই সকর্মপরায়ণ হতাম!হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন যে, বান্দা যে আমল করবে এবং যা কিছু বলবে, তাদের সেই আমল ও সেই উক্তির পূর্বেই আল্লাহ তা'আলা তার খবর প্রদান করেছেন। আর প্রকৃতপক্ষে তাঁর চেয়ে বেশী খবর আর কে রাখতে পারে? আর কেই বা তার চেয়ে সত্য ও সঠিক খবর দিতে পারে? আল্লাহ তাআলা পাপীদের উপরোক্ত তিনটি উক্তির বর্ণনা দিয়েছেন। অন্য জায়গায় মহান আল্লাহ এই সংবাদ দিয়েছেন যে, যদি তাদেরকে পুনরায় দুনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়াও হয় তবে তখনো তারা হিদায়াত কবুল করবে না, বরং নিষিদ্ধ কাজগুলো আবার করতে থাকবে। এখানে তারা যা কিছু বলছে সবই মিথ্যা প্রমাণিত হবে। হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সঃ) বলেছেনঃ “প্রত্যেক জাহান্নামীকে তার জান্নাতের বাসস্থান দেখানো হবে। ঐ সময় সে বলবেঃ “যদি আল্লাহ তা'আলা আমাকে হিদায়াত দান করতেন।” সুতরাং এটা তার জন্যে হবে দুঃখ ও আফসোসের কারণ। আর প্রত্যেক জান্নাতীকে তার জাহান্নামের বাসস্থান দেখানো হবে। তখন সে বলবেঃ “যদি আল্লাহ আমাকে হিদায়াত দান না করতেন (তবে আমাকে এখানেই আসতে হতো)।” সুতরাং এটা হবে তার জন্যে শোকরের কারণ।” (এ হাদীসটি ইমাম আহমাদ (রঃ) বর্ণনা করেছেন)যখন পাপীরা পুনরায় দুনিয়ায় প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা করবে এবং আল্লাহ তাআলার নিদর্শনাবলী অবিশ্বাস করার কারণে আফসোস ও দুঃখ প্রকাশ করবে এবং তাঁর রাসূলদের আনুগত্য না করার কারণে দুঃখে ফেটে পড়বে তখন মহান আল্লাহ বলবেনঃ প্রকৃত ব্যাপার তো এই যে, আমার নিদর্শন তোমাদের নিকট এসেছিল, কিন্তু তোমরা ওগুলোকে মিথ্যা বলেছিলে ও অহংকার করেছিলে এবং তোমরা তো কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত। এখন তোমাদের এই দুঃখ, লজ্জা ও অনুতাপ বৃথা। এসব করে এখন আর কোনই লাভ হবে না।